প্যারিসে বাংলাদেশি কমিউনিটিতে ‘ভাতিজা’ ও রাব্বানির বিরোধ: BMW লটারি বিতর্কে নতুন উত্তেজনা

প্যারিসে বাংলাদেশি কমিউনিটি: ‘ভাতিজা’ ও রাব্বানির বিরোধ
প্যারিস, ফ্রান্স 
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ‘ফ্রাঙ্কো-বাংলা সামার ফেস্ট’ কনসার্টকে কেন্দ্র করে আয়োজিত একটি বিএমডব্লিউ (BMW) লটারিকে ঘিরে সৃষ্ট বিতর্কের পর ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির দুই পরিচিত ব্যক্তিত্বের দীর্ঘদিনের বিরোধ নতুন মাত্রা পেয়েছে। মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলমান এই দ্বন্দ্ব কমিউনিটির একটি বড় অংশকে বিভক্ত করে ফেলেছে।
এই বিরোধের দুই পক্ষ হলেন সৈয়দ ইরফান, যিনি কমিউনিটিতে রূপক নাম ‘ভাতিজা’ নামে অধিক পরিচিত, এবং কৌশিক আহমেদ রাব্বানি, যিনি ‘ফ্রঁসে আভে রাব্বানি’ (Français Avec Rabbani) ও ‘ওফিওরা ফরমেশন’ (OFIORA Formation)-এর প্রতিষ্ঠাতা। প্রতিষ্ঠান দুটি ফরাসি ভাষা শিক্ষা ও প্রশাসনিক সহায়তা সেবা দিয়ে থাকে।
প্রেক্ষাপট
সিটিজেন পার্সপেক্টিভ-এর প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সৈয়দ ইরফান একসময় কৌশিক রাব্বানির প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি সেখান থেকে বেরিয়ে এসে নিজস্ব সেবা কার্যক্রম শুরু করেন।
ইরফানের চাচা, প্রয়াত সমাজসেবী সৈয়দ আবুল হাসান সবুজ, যিনি কয়েক বছর আগে বাংলাদেশে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা যান, তাঁর মৃত্যুর পর ইরফান ‘ফ্রান্সে রাজনৈতিক আশ্রয় ও অভিবাসন’ নামে পরিচিত বাংলা ফেসবুক পেজ ও গ্রুপটির পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিকে সহায়তা দেওয়ার উদ্দেশ্যে নিজস্ব একটি অফিস প্রতিষ্ঠা করেন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশি অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য বিভিন্ন সেবা প্রদানকে কেন্দ্র করে উভয় পক্ষের মধ্যে প্রতিযোগিতা এবং পরবর্তীতে বিরোধের সৃষ্টি হয়।
ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতা
সিটিজেন পার্সপেক্টিভ-এর জানা মতে, সৈয়দ ইরফান দীর্ঘদিন ধরে কমিউনিটিভিত্তিক সহায়তা সেবার বাণিজ্যিকীকরণের সমালোচনা করে আসছেন। তাঁর অভিযোগ, কিছু প্রতিষ্ঠান নতুন অভিবাসী এবং ফরাসি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে সীমিত ধারণাসম্পন্ন ব্যক্তিদের কাছ থেকে অনুবাদ, অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুকিং, নথিপত্র প্রস্তুত এবং অন্যান্য প্রশাসনিক সহায়তার জন্য অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে থাকে।
ইরফানের সমর্থকদের দাবি, তাঁর এই প্রকাশ্য সমালোচনার ফলে একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়িক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এ কারণে অতীতে তিনি বিভিন্ন ধরনের হুমকিরও সম্মুখীন হয়েছেন। তবে এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ফ্রান্সে বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে এই খাতের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে কৌশিক আহমেদ রাব্বানিকে বিবেচনা করা হয়। ‘ফ্রঁসে আভে রাব্বানি’ এবং পরবর্তীতে ‘ওফিওরা ফরমেশন’-এর মাধ্যমে তিনি প্রথমে ফরাসি ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করেন এবং পরে প্রশাসনিক সহায়তা সেবায় কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেন।
পরবর্তীতে তাঁর ব্যবসার পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। এর মধ্যে রয়েছে বাংলায় ড্রাইভিং থিওরি পরীক্ষার প্রস্তুতি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন, চলচ্চিত্র প্রদর্শন, ক্রীড়া সংগঠন পরিচালনা, ব্যবসায়িক পরামর্শ, রেস্তোরাঁ, হোটেল এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক উদ্যোগ।
রাব্বানির দাবি, তিনি প্রথমে প্রকৌশল বিষয়ে এবং পরে ফ্রান্সে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন।
সেবামূল্য নিয়ে অভিযোগ
রাব্বানির সমালোচকদের অভিযোগ, প্রশাসনিক সহায়তা সেবার জন্য সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ নেওয়া হতো, যার মধ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য আইনগত সহায়তা সমন্বয়ও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তাদের আরও দাবি, ফ্রান্সে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ বা সমন্বয়ের জন্য গ্রাহকদের অর্থ প্রদান করতে হয়েছে।
এসব অভিযোগ কয়েক বছর ধরে কমিউনিটিতে প্রচলিত রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে কোনো আদালত রাব্বানিকে দায়ী সাব্যস্ত করেনি এবং তিনি প্রকাশ্যে তাঁর ব্যবসায়িক কার্যক্রমের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
কনসার্ট ও লটারি বিতর্ক
সাম্প্রতিক উত্তেজনার সূত্রপাত ঘটে ‘ফ্রাঙ্কো-বাংলা সামার ফেস্ট’-কে কেন্দ্র করে, যেখানে বাংলাদেশি জনপ্রিয় রকশিল্পী জেমস প্যারিসে সঙ্গীত পরিবেশন করেন।
এই আয়োজন একই নামে পূর্বে একটি উৎসব আয়োজনের ব্যর্থ প্রচেষ্টার স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। সে সময় কর্তৃপক্ষের অনুমতি প্রত্যাহারের কারণে অনুষ্ঠানটি বাতিল হয়ে যায়।
সেই আগের আয়োজনকে কেন্দ্র করে অনলাইনে টিকিটের অর্থ ফেরত, প্যারিসে বাংলাদেশ দূতাবাসের সম্পৃক্ততায় মানবপাচারের অভিযোগ এবং অন্যান্য বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো আদালত বা কর্তৃপক্ষের প্রকাশ্য আইনি সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।
বর্তমান বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কনসার্ট উপলক্ষে আয়োজিত একটি বিএমডব্লিউ গাড়ির লটারি।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত কয়েকজন দর্শক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারকারীরা অভিযোগ করেন যে, লটারিতে পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা ছিল না এবং বিজয়ীকে পূর্বনির্ধারিতভাবে নির্বাচন করা হয়েছিল।
লটারির বিজয়ী হিসেবে পরিচিত রিজওয়ানা, যিনি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত একজন ট্রান্সজেন্ডার নারী, পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন।
সৈয়দ ইরফান (ভাতিজা) প্রকাশ্যে লটারির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন যে, তাঁর বিশ্বাস বিজয়ী নারী নিজেও হয়তো কোনো কারসাজির শিকার হয়েছেন। প্রয়োজনে তাঁকে সহযোগিতা করার আশ্বাসও দেন তিনি।
অন্যদিকে, অনুষ্ঠানের আয়োজক ও তাদের সমর্থকেরা লটারিকে ঘিরে উত্থাপিত সব ধরনের অনিয়মের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
উত্তপ্ত মুখোমুখি
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলমান বাকযুদ্ধ একপর্যায়ে চলতি সপ্তাহে দুই পক্ষের সরাসরি সাক্ষাতে রূপ নেয়।
উভয় পক্ষের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী, আলোচনাটি একপর্যায়ে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে উত্তপ্ত বাকবিনিময় দেখা যায়।
ইরফানের সমর্থকদের দাবি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় পুলিশকে ডাকা হয়।
অন্যদিকে, রাব্বানির সমর্থকেরা ঘটনার ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাদের দাবি, বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটানো এবং তাদের বিরুদ্ধে আনা বিভিন্ন অভিযোগের জবাব দেওয়া।

Popular posts from this blog

চোখের জলে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বললেন নেইমার

বিদেশি ঋণ ছাড়াল ১১৩ বিলিয়ন ডলার

হারতে বসলে ইসরাইলের পক্ষে আমরা যুদ্ধে নামবো: উগান্ডার সেনাপ্রধান